ফ্ল্যাশব্যাক ২০১৪: অল্টারনেটিভ সিনেমার ক্লাস চলছে, হঠাৎই কথা উঠল, সিনেমা কীভাবে প্রতিরোধের ছবি হয়ে উঠতে পারে তা নিয়ে। আর প্রসঙ্গতই উঠে এলো আনন্দ পটবর্ধনের ‘রাম কে নাম’ এর কথা, ছবিটি দেখতে দেখতে আমরা বুঝতে পারি কীভাবে এটি পৌরাণিক রামচন্দ্র বা হিন্দু ধর্মের বিরুদ্ধে কোনো অবস্থান নেয় না, বরং প্রতিবাদ করে সেই রাজনীতির বিরুদ্ধে, যা রামের নামকে ব্যবহার করে ক্ষমতার ভাষা তৈরি করে। দেখি পটবর্ধন কীভাবে ‘রাম কে নাম’কে হিন্দু মৌলবাদের উত্থান এর এক সাক্ষী হিসেবে তুলে ধরেছেন, যেখানে অযোধ্যার মন্দির-মসজিদ বিতর্ককে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করে শুরু হয় হিন্দু ভোটব্যাঙ্ককে সংগঠিত করার এক নির্লজ্জ দক্ষিণপন্থী কৌশল।
সেই শুরু… তারপর এল ইরানিয়ান ছবির ক্লাস, ধীরে ধীরে বুঝতে পারি ইরানিয়ান ছবি শুধু দৃশ্যকাব্যের আখ্যান নয়, বরং হয়ে ওঠে একটি সমাজ সংগ্রাম চিত্রকল্প, যে সমাজে কী দেখা যাবে, কি যাবে না, কে কথা বলবে, কে বলবে না, কোন নারী কীভাবে বা কতটা পর্দায় থাকবে, কোন সত্য উচ্চারণ করা যাবে, কি উচ্চারণ করা যাবে না, এই সবকিছুর ওপর যখন জারি এক রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ, তখন সেখানে ক্যামেরাই হয়ে ওঠে প্রতিরোধের একমাত্র হাতিয়ার। সেন্সরশিপ, নিষেধাজ্ঞা, নজরদারি এবং রাষ্ট্রীয় শাসনযন্ত্রের বিরুদ্ধে কি দুর্দম সাহসে ইরানের স্বাধীন চলচ্চিত্রচর্চা বার বার ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ জানায় তাতো প্রথম শিখি যাদবপুরেই ।
ঠিক যেমন যাদবপুরই প্রথম শেখায় কিভাবে সিনেমা প্রতিবাদকে সবসময় মিছিল, স্লোগান বা সরাসরি রাজনৈতিক ভাষণে সীমাবদ্ধ রাখে না, বরং একটি মেয়ের হাঁটা, একটি গাড়ির ভেতরের কথোপকথন, একটি ঘরের দরজা, একটি নীরব লং টেক , একটি জানালার বাইরে তাকানো ডিপ ফোকাস, অথবা একটি নিষিদ্ধ শরীরের উপস্থিতিকেও রাজনৈতিক করে তোলে। সিনেমাই আমাদের দেখায়, রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ শুধু সংসদ, আদালত বা পুলিশের মধ্যে আটকে থাকে না। তা ঢুকে পড়ে পোশাকে, ভাষায়, ভালোবাসায়, শরীরে, পারিবারিক সম্পর্কে, সর্বোপরি ক্যামেরার ফ্রেমে…
বাই দ্যা ওয়ে আরেকবার মনে করিয়ে দি সময়টা ২০১৪, অন্যায় ভাবে ক্যাম্পাসে পুলিশি অনুপ্রবেশের প্রতিবাদে পুরো ক্যাম্পাস তখন উত্তাল, কিন্তু তার জন্য ক্লাস থেমে নেই, সকালে কিয়েরোস্তামি বা পানাহির প্রতিবাদ বিকেলে গড়ে তুলছে ছাত্র শিক্ষকের হাতে হাত ধরা ব্যারিকেড…
এটাই যাববপুর, যেখানে সিস্টেম কে প্রশ্ন করতে শেখানো হয়, যেখানে we the people of India মুখস্ত নয় আত্মস্থ করা হয়… যেখানে সিস্টেমের গলদ দূর করতে মানস দা’র মতন শিক্ষক অবলীলায় কাঁধে তুলে নেন বুনিয়াদি সক্রিয় রাজনীতির গুরু দায়িত্ব। কারণ আমাদের যাদবপুরই শেখায়, এই অসময়ে অ্যাপলিটিকাল হওয়ার মতো নির্লজ্জ পলিটিক্স আর দুটি নেই।
আমি গর্বিত যে আমি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, আমি গর্বিত আমি মানস দা, সঞ্জয় দা, মৈনাক দা, অভিজিৎ দা , পিকলু দা বা মধুজা দির ছাত্র, আমি গর্বিত আমার যাদবপুর কে নিয়ে যারা অনায়াসে ক্ষমতার পদলেহন কে অগ্রাহ্য করে মুক্তচিন্তা কে সমর্থন করে ও করে এসেছে , যারা একজোট হয়ে ঘৃণার ব্যাপারী বিবেক অগ্নিহোত্রি কে ক্যাম্পাসে ঢুকতে দেয়না, যারা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে প্রতিবাদ করে, প্রতিরোধ চালিয়ে ক্ষমতাকে কে বাধ্য করে ক্ষমা চাইতে। মুক্তচিন্তার জন্য ছাত্র শিক্ষক নির্বিশেষে, পড়াশুনার একটুমাত্র ক্ষতি না করেও দিনের পর দিন চালিয়ে যায় আন্দোলন, সোচ্চারে হুঙ্কার দেয় ‘হোক কলরব’ ।
আর রইল পরে, শিক্ষার মানের কথা তা সারা পৃথিবীর অ্যাকাডেমিয়ায় যাদবপুর ও তার ছাত্র শিক্ষকদের অবস্থান ই বারে বারে প্রমাণ করে দেয় যাদবপুরের আসল প্রজ্ঞা। আর ‘ওরা বড্ড পলিটিকাল’ বলে যারা নিজেদের ছেলে মেয়ে দের ব্যাঙ্গালোরে পাঠান তাদের জন্য তো রবিঠাকুর বলেই গেছেন - নিন্দুকেরা অ্যাডমিশন পায় না বলিয়াই মন্দ কথা বলে…
@highlight

Comments
Post a Comment