সাতোশি কন: স্মৃতি, স্বপ্ন , সিনেমা ও বাস্তবতার কোলাজ

 


সাতোশি কন অ্যানিমের ইতিহাসে সন্দেহাতীত ভাবে এমন একজন নির্মাতা যিনি, অ্যানিমের কনভেনশনাল ল্যাঙ্গুয়েজের মধ্যে কোনোদিনই নিজেকে আটকে রাখতে পারেন নি। পারফেক্ট ব্লু (১৯৯৭), মিলেনিয়াম অ্যাকট্রেস (২০০১), টোকিও গডফাদার্স (২০০৩), প্যারানইয়া এজেন্ট (২০০৪) আর প্যাপ্রিকা (২০০৬), প্রায় সবকটি কাজেই রিয়্যালিটি আর পারফরম্যান্স, মেমরি আর ফ্যান্টাসি, প্রাইভেট সেলফ আর তার মিডিয়েটেড ইমেজের মাঝের গন্ডিগুলো তাই তিনি ইচ্ছে করেই ঝাপসা করে দিয়েছেন।

ব্যক্তিগত ভাবে আমার কাছে কন সবথেকে ইন্টারেস্টিং হয়ে ওঠেন তাঁর এডিটিং আর সিনেম্যাটিক স্পেসের ব্যবহারে। স্বপ্ন, স্মৃতি, ফিল্ম-উইদিন-ফিল্ম বা হ্যালুসিনেশন, এগুলোকে তিনি আলাদা আলাদা ভিজ্যুয়াল টেরিটরি হিসেবে দেখান না। বরং একটি স্পেস সরাসরি আরেকটির মধ্যে ঢুকে পরে প্রায় অনায়াসেই। একটা সময়ে শুরু হওয়া জেসচার শেষ হয় কয়েক দশক পরে; একটা দরজা খুলে প্রোটাগনিষ্ট চলে যায় রিয়্যালিটি থেকে মেমরিতে; একটা ম্যাচ কাট খুব সাধারণ একটা মুহূর্তকে হঠাৎই বদলে দেয় সাইকোলজিক্যাল রাপচারে…
মিলেনিয়াম অ্যাকট্রেস-এ যেমন জাপানিজ সিনেমার হিস্ট্রি, চিয়োকোর পার্সোনাল মেমরি আর সে যে ফিল্মগুলোতে অভিনয় করেছে, একটা সময়ের পর এগুলোকে আর আলাদা করা যায় না। কন এখানে এডিটিংকে শুধু টেকনিক হিসেবে ব্যবহার করেন নি; বরং এডিটিংই যেন মেমরির একটা থিয়োরি হয়ে ওঠে। ঠিক যেমন আমরা নিজেদের জীবনেও মুহূর্ত গুলোকে ক্রোনোলজিক্যাল অর্ডারে মনে রাখি না। কিছু ইমেজ, কিছু ঘটনা, কিছু অসম্পূর্ণ স্মৃতি জুড়ে জুড়েই আমরা অতীতকে রিকনস্ট্রাক্ট করি।
আবার পারফেক্ট ব্লু-তে এই ইনস্টেবিলিটি চলে যায় আরও অন্ধকারে, আরও গহীনে। পপ আইডল থেকে অ্যাকট্রেস হয়ে ওঠার সময় মিমার জার্নি ধীরে ধীরে সেলিব্রিটি কালচার, স্পেকটেটরশিপ আর ফ্র্যাগমেন্টেড আইডেন্টিটির একটা অস্বস্তিকর আখ্যান হয়ে ওঠে। তার পাবলিক পার্সোনা একটা সময় যেন তার রিয়্যাল সেলফের সঙ্গেই কম্পিটিশন শুরু করে দেয়। ইনস্টাগ্রাম, ইনফ্লুয়েন্সার, ডিপফেক কিংবা অ্যালগরিদমিক্যালি ম্যানুফ্যাকচার্ড আইডেন্টিটি আমাদের এভরিডে রিয়্যালিটি হওয়ার অনেক আগেই কন আমাদের একটা অস্বস্তিকর প্রশ্ন করেছিলেন...

একজন মানুষ যখন নিজেই অন্যদের কনজিউম করার মতো একটা ইমেজ হয়ে যায়, তখন সেই সেলফের ওনারশিপ আসলে কার থাকে?

আর প্যাপ্রিকা-তে এই প্রশ্নটাই সেলিব্রিটি কালচার ছাড়িয়ে টেকনোলজির দিকে চলে যায়। এখানে ড্রিমকে অ্যাকসেস করা যায়, রিপ্রোডিউস করা যায়, এমনকি একটা সময় সেটা কনটেজিয়াসও হয়ে ওঠে। স্ক্রিন আর শুধু কনশাসনেসকে রিপ্রেজেন্ট করে না; টেকনোলজিই ধীরে ধীরে কনশাসনেসের ভিতরে ঢুকে সেটাকে রিঅর্গানাইজ করতে শুরু করে। btw আমাদের নোলান বাবুর (অরিজিনাল) ছবি ইনসেপশান আসার প্রায় সাড়ে চারবছর আগেই কন এই কাজটা করে ফেলেছিলেন (জাস্ট সেইং)
আজকের আই-জেনারেটেড ইমেজারি, ভার্চুয়াল আইডেন্টিটি আর সিন্থেটিক মিডিয়ার বাজারে তাই প্যাপ্রিকা এখন আরও বেশি করে প্রাসঙ্গিক। কনের ভয়টা শুধু এই নয় যে ইমেজ ফেক হয়ে যেতে পারে। তাঁর মূল প্রশ্নটি আরও অনেক অনেক বেশি অস্বস্তিকর...একটা সময় যদি ইমেজ আর লিভড এক্সপেরিয়েন্সের মধ্যে তফাতটাই আর আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ না থাকে, তখন কী হবে?
নিন্দে করছি না তবে ট্রেডিশনাল অ্যানিমে স্টাডিজে যেটা অনেকে করে থাকেন তা হল কনকে শুধু ‘ড্রিম আর রিয়্যালিটির ফিল্মমেকার’ হিসাবে দাগিয়ে দেন… আমার মতে,এটার মতো ভুল আর দুটি হয় না। কনের ছবি একটু বিশ্লেষণাত্মক দৃষ্টিভঙ্গিতে বিচার করলেই বোঝা যায় তাঁর আসল উদ্দেশ্য ছিল সিনেমা, টেলিভিশন, অ্যাডভার্টাইজিং, মেমরি, ফ্যান্টাসি আর পারফরম্যান্সের মধ্যে দিয়ে আমরা কীভাবে একটা দৃশ্য নির্ভর রিয়্যালিটি কনস্ট্রাক্ট করি সেটাকে ক্রিটিক করা। যেমন টোকিও গডফাদার্স, যেটা তাঁর তুলনামূলকভাবে গ্রাউন্ডেড ফিল্ম, সেখানেও কোইনসিডেন্স, স্টোরিটেলিং আর সোশ্যাল ভিজিবিলিটি নিয়ে কি অন্যায়াসে তিনি খেলে গেছেন।
এমনকি টেকনিকাল দিক দিয়ে বলতে গেলেও অ্যানিমেশন নিয়েও কনের অ্যাপ্রোচ বেশ আলাদা ভাবে চোখে পড়ে। অ্যানিমেশন তাঁর কাছে শুধু ইলাস্ট্রেশন বা ফ্যান্টাসি তৈরির মিডিয়াম ছিল না। বরং এটা তাঁকে এমন একটা এডিটিং ফ্রিডম দিয়েছিল, যা লাইভ-অ্যাকশন সিনেমায় পাওয়া অনেক বেশি কঠিন। সাতোশি কনের কাছে অ্যানিমে শুধু গল্প বলার মিডিয়াম নয়; অ্যানিমে নিজেই হয়ে ওঠে সফিস্টিকেটেড সিনেম্যাটিক থটের একটি ফর্ম। একটা ফ্রেম থেকে পরের ফ্রেমেই বডি, লোকেশন, আইডেন্টিটি বা টাইম বদলে যেতে পারে, কোনও এলাবোরেট এক্সপ্লানেশন ছাড়াই এই স্বাধীনতাটা তিনি খুব দায়িত্বের সাথে কাজে লাগিয়েছেন তার প্রায় সবকটি ছবিতেই। তাই কনের কাছে অ্যানিমেশন রিয়্যালিটি থেকে এসকেপ করা বা বেরিয়ে আসার রাস্তা নয়; বরং সিনেম্যাটিক রিয়্যালিটি যে নিজেই কতটা আনস্টেবল, সেটা দেখানোর একটা অসাধারণ (বা অঙ্কের ভাষায় বলা ভালো নেসেসারি অ্যান্ড সাফিসিয়েন্ট) মিডিয়াম।
২০১০ সালে মাত্র ৪৬ বছর বয়সে সাতোশি কন মারা যান। ফলে তাঁর শেষ করে যাওয়া কাজের সংখ্যা আশ্চর্যজনকভাবে কম। কিন্তু হয়তো সেই ছোট ফিল্মোগ্রাফিই তাঁকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে। মাত্র এক দশকের একটু বেশি সময়ে তিনি নিজের একটা আলাদা সিনেম্যাটিক গ্রামার তৈরি করেছিলেন, যেখানে এক একটা কাট হয়ে ওঠে সাইকোলজিক্যাল ইভেন্ট, স্ক্রিন পরিণত হয় আনস্টেবল বর্ডারে, আর স্পেকটেটর অনিশ্চিত হয়ে থাকে যে সে রিয়্যালিটি দেখছে, মেমরি দেখছে, পারফরম্যান্স দেখছে, নাকি এমন একটা ইমেজ দেখছে, যেটা একই সঙ্গে এই সবকিছু হওয়ার অভিনয় করে যাচ্ছে।

Comments