গুরু একটাই… উত্তম কুমার!
২০১০ সাল। সেন্ট জেভিয়ার্সের ফার্স্ট সেমেস্টার। সাবজেক্ট টা মনে নেই, তবে তমাল স্যারের ক্লাস…অ্যাসাইনমেন্ট টা ছিলো আমাদের পছন্দের যেকোনো একটি ছবির পোস্টার মোনোক্রোমে আঁকতে হবে, তাও আবার ফুল শিট (A1) এ…আফটার অল মফস্বল। ওয়ার্ল্ড সিনেমা সম্পর্কে জ্ঞান বলতে প্রায় কিছুই নেই। কম্পোজিশন কী, টাইপোগ্রাফি কী, একটা ভালো পোস্টার ঠিক কেন ভালো হয়ে ওঠে, কোথায় শুরু করতে হয়, কোথায়ই বা থেমে যেতে হয়, সেসবও শেখা শুরু হয়ছে সবে সপ্তাহ খানেক আগেই। ফলত কম্পোজিশন কি হবে, টাইপোগ্রাফি কেমন হবে সে সব কিছুই ছিলো এলোমেলো এবং অনিশ্চিত।
কিন্তু কাকে নিয়ে পোস্টারটা করব, সেটা নিয়ে বিন্দুমাত্র ডাউট ছিল না।
প্রথম পোস্টার, হবে শুধু গুরুর… শুধু উত্তমকুমার এরই।
আমাদের জেনারেশনের আর পাঁচজনের মতোই ছোটবেলার উত্তমকুমার বলতে, প্রথমেই মাথায় আসত ধন্যি মেয়ে, মৌচাক, ওগো বধূ সুন্দরী মার্কা হালকা মুচমুচে ছবিগুলো। টিভিতে বারবার দেখতাম। অভিনয়েরও ব্যাকরণ হয় তা মোটেই জানা ছিল না, ব্যাকরণ তখন শুধু কালীপদ চৌধুরী বা এ টি দেব এর… কাজেই সিনেমার ভাষা বোঝা তো আরও দূরের কথা। তখন একটা জিনিস দেখতাম, আর অবাক হোয়ে যেতাম, যে পর্দার বা চারপাশের ক্যাবলাকান্ত দুনিয়ায় এই হালকা লিপস্টিক পরা লোকটা কী অসম্ভব রকম স্মার্ট আর স্বতঃস্ফুর্ত! কি অদ্ভুত মন কেমন করা হাসি, কি ক্লেদহীন কথা বলার ধরন… ইনফ্যাক্ট ওসব থাক একটা মানুষ ওভাবে সিগারেট জালিয়ে ঠোঁটের কোণে ধরে রেখে জাস্ট কিছু না বলে (বা করে) শুধু ফ্রেমের মধ্যে দাঁড়িয়ে থেকে ফ্রেমটাকে অমনি করে নিজের করে নেয় কিভাবে। মোদ্দা কথা পর্দায় উত্তমকুমার থাকলে অন্যদের দিকে চোখটা যেন একটু কমই যেত।তারপর ক্লাস ইলেভেনে সায়েন্স পড়ার নাটক করছি যখন, পাড়ার ডিভিডি পার্লারে যাওয়া বাড়তে লাগল, অমনি করেই একদিন নায়ক দেখে ফেললাম আর কিছু একটা যেন বদলে গেল।
সত্যজিৎএর নায়ক-এ যে উত্তমকুমারকে দেখি , তিনি আমাদের ছোটবেলার সেই চেনা উত্তমকুমার তো বটেই আবার কোথায় যেন একেবারেই আলাদা। তাঁর চিরচেনা ক্যারিশমার আড়ালে আছে ভয়, আছে একাকিত্ব, আছে অহংকার, আছে অপরাধবোধ, আর সর্বোপরি আছে নিজের তৈরি একটা বিশাল ছদ্ম ইমেজের মধ্যে আটকে পড়ার অপরিসীম ক্লান্তি। অরিন্দম মুখার্জি আপাতদৃষ্টিতে সুপারস্টার, অথচ সেই স্টারের পরতটা একটু একটু করে খুলে গেলে ভিতর থেকে বেরিয়ে আসে ভীষণ সাধারণ, ভীষণ দুর্বল একজন মানুষের অবয়ব।
এখন যাদবপুর টাদবপুর ঘুরে এসব ট্যান দিচ্ছি ঠিকই, কিন্তু তখন এত কিছু মোটেও ভেবে দেখিনি, শুধু মনে আছে, মানুষটাকে ছবির পর্দায় দেখলেই স্তব্ধ হয়ে যেতাম।
তারপর বয়স বাড়ল, ফিল্ম স্টাডিজ এলো জীবনে, সঞ্জয়দার ক্লাস করলাম… আরবান মডার্নিটি(নকশাল না), বেঞ্জামিন, ব্যোদলেয়র এসব মিলে মিশে উত্তমকুমারকে দেখা ও পড়ার ধরনটাও বদলালো.. ফলতঃ ছবিগুলোও অন্যভাবে দেখতে শুরু করলাম। বুঝলাম অজয় করের ছবিতে উত্তম ছাড়াও অনবদ্য ক্যামেরা আছে, তুখোড় আলোর কারসাজি আছে, সর্বোপরি অজয় কর আছেন। সত্যজিৎ বা তপনবাবুর ছবিতেও পরিচালকের নিশ্ছিদ্র নিয়ন্ত্রণ আছে, কাজেই সেখানে উত্তমকুমার থাকলেও তিনি এক বৃহত্তর সিনেম্যাটিক ভাষ্যর অংশ। আর ঠিক তাই আমার বার বারই মনে হয় উত্তমকুমারকে বুঝতে গেলে ভালো বা নামী পরিচালকের কাজ সরিয়ে রেখে সেইসব ছবিগুলো দেখতে হয় যেখানে চিত্রনাট্য অতি সাধারণ, পরিচালনা ভয়ঙ্কর দুর্বল, ক্যামেরার কাজও তথৈবচ… কিন্তু তবুও ছবিটার মধ্যে একটা ‘ইয়ে’ আছে, ছবিটা আজও দেখা যায় অনায়াসে…
আর সেই ইয়ে বা সাহেবদের ভাষায় এক্স ফ্যাক্টরটার নামই উত্তমকুমার।
একটা অন্যথা খাজা সিনকে জাস্ট একটা তাকানো দিয়ে, জাস্ট একটা পজ দিয়ে, একটু হেসে, আলতো সিগারেটটা ধরিয়ে, অথবা শুধু চুপ করে দাঁড়িয়ে থেকে অন্য জায়গায়, অন্য উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা (প্পড়ুন ক্যালমা) ছিলো লোকটার। এবার এই লেখাটায় স্ট্যানিস্লাভস্কি, অভিনয়ের তত্ত্ব ইত্যাদি এনে ব্যাপারটাকে জটিল অ্যাকাডেমিক পেপার বানানোই যেত। কিন্তু এটা তো একটা ফ্যান বার্থডে পোস্ট। কাজেই তার কাছে মানুষটা পর্দায় আছে, ভ্রু বাঁকিয়ে (সুচিত্রার থেকেও বেটার) জবাব দিচ্ছে, নির্মল হাসিতে মনটা ভরিয়ে দিচ্ছে সেটাই যথেষ্ট।
তাই এত বছর পরে এই কাঁচা পোস্টারটার (এখনও স্টুডিওর দেওয়ালে টাঙ্গানো) দিকে তাকালে তাই ভুলগুলো আর খুব একটা চোখে পড়ে না। বরং সেই শহরতলির ছেলেটার কথা মনে পড়ে, যে বিশ্ব সিনেমা দেখেনি, ডিজাইনও প্রায় কিছুই জানে না, কিন্তু একটা ব্যাপারে তার কোনও দ্বিধা ছিল না। তার প্রথম পোস্টারের নায়ক কে হবে…
আজও সেই অবস্থানটা বিশেষ বদলায়নি, কারণ গুরু একটাই… উত্তম কুমার!


Comments
Post a Comment