যাদবপুর একটা অভ্যাসের নাম

 

ক্ষিণপন্থী রাজনীতির সঙ্গে আমরা একমত নই সেটা মোটেই কোনও সমস্যা নয়, সমস্যাটা আরও মৌলিক। যে রাজনীতির ধারা আপনাকে প্রশ্ন করার আগে আনুগত্য শেখায়, ইতিহাসকে বুঝবার বদলে তার একটি সুবিধাজনক এবং সহজপাচ্য সংস্করণ মুখস্থ করায়, আর সর্বোপরি দেশকে ভালোবাসার প্রমাণ হিসেবে শাসকসম সরকারের আনুগত্য দাবি করে… সেই রাজনীতি আসলে ক্ষমতার, গণতন্ত্রের না।

প্রথমেই মনে রাখতে হবে দেশ আর সরকার এক নয়। রাষ্ট্র আর শাসকদলও এক নয়। আর সম্ভবত বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে জরুরি কাজটাই হল এই ছোট অথচ ভয়ঙ্কর গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্যগুলো আমাদের শেখানো… বোঝানো।
যাদবপুরে সিনেমা পড়তে গিয়ে আমরা যেমন শিখেছিলাম, প্রতিবাদ মানেই সবসময় রাস্তায় নেমে স্লোগান দেওয়া নয়। আনন্দ পটবর্ধনের রাম কে নাম দেখিয়েছিল রামকে ভালোবাসা আর রামের নামে রাজনীতি করাটা এক জিনিস নয়। পানাহি বা কিয়ারোস্তামি শিখিয়েছিলেন, রাষ্ট্র যখন ঠিক করে দিতে শুরু করে কে কথা বলবে, কোন শরীর দেখা যাবে, কোন গল্প বলা যাবে, তখন একটা ক্যামেরাও রাজনৈতিক হয়ে ওঠে। ঠিক একইভাবে একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে কোন বই পড়ানো হবে, কোন বক্তা কথা বলবেন, কোন ছাত্র প্রশ্ন করবে, কোন মতকে ‘দেশবিরোধী’ বলা হবে, এই সিদ্ধান্তগুলোও আর নিছক অ্যাকাডেমিক থাকে না।

এখানেই মুক্তচিন্তার সাথে দক্ষিণপন্থী রাজনীতির সঙ্গে সবচেয়ে বড় বিরোধ। আজ কাউকে ‘অ্যান্টি-ন্যাশনাল’ বলা হল, কাল ‘নকশাল’, পরশু অন্য কোনো নাম। নামগুলো বদলায়, ন্যারেটিভটা একই থেকে যায়. . . জনতার সঠিক প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে, বরং তার কথা বলার অধিকারটাকেই সন্দেহের মধ্যে ফেলে দেওয়া। এবং মজার ব্যাপার হল, ক্ষমতা প্রায় সবসময়ই প্রতিবাদকে অসভ্য বলে এসেছে। যে ছাত্র প্রশ্ন করে সে বেয়াদব, যে অধ্যাপক সরকারের সমালোচনা করেন তিনি পক্ষপাতদুষ্ট, যে শিল্পী অস্বস্তিকর ছবি বানান তিনি প্রোপাগান্ডিস্ট, যে নাগরিক রাস্তায় নামেন তিনি ‘troublemaker’। কিন্তু ইতিহাসের মজা হল, কয়েক দশক পরে আমরা আবার সেই troublemaker-দের ছবিতেই মালা দিই, পেডেস্টাল এ বসাই । তাই প্রতিরোধ আমাদের কাছে কোনো রোম্যান্টিক শব্দ নয়।

প্রতিরোধ গণতন্ত্রের ‘correction mechanism’

ক্ষমতা যে দলের হাতেই থাকুক, তাকে যদি কেউ প্রশ্ন না করে, তার ভুল ধরার ব্যবস্থাটাই ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে যায়। আজ যে সরকারকে আপনি ভালোবাসেন, কাল সেই সরকারেরই কোনো সিদ্ধান্ত আপনার বিরুদ্ধে যেতে পারে। তখন আপনার সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হবে সেই অধিকারগুলোর, যেগুলো অন্য কারও প্রতিবাদের সময় আপনি অপ্রয়োজনীয় বলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন। আর এখানেই যাদবপুরের মতো বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা ভয়ঙ্কর জরুরি।কারণ যাদবপুর নেকু পুসু মুনু বাধ্য নাগরিক তৈরির কারখানা নয়। তার কাজ এমন মানুষ তৈরি করা যে অধ্যাপককেও বলতে পারে, “আপনি ভুল”; Vice-Chancellor-কেও প্রশ্ন করতে পারে; মুখ্যমন্ত্রী বা প্রধানমন্ত্রীকেও বলতে পারে, “আপনার সঙ্গে একমত নই, এবং কেন নই সেটা বলতে চাই।” উলঙ্গরাজার সেই বাচ্চাটার ইনসেন্সটা আজ বড্ড প্রয়োজন। কারণ প্রকৃত শিক্ষা সেটাই যেটা consensus এর সাথে disagreement এরও পাঠ দেয়।
কারণ একমাত্র ইতিহাসই সাক্ষী যে বিদ্যাসাগর হোক বা আম্বেদকর যে মানুষগুলো আমাদের সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছেন, তাঁরা কেউই তাঁদের সময়ের ‘comfortable consensus’ কে মেনে নেননি। কারণ ‘না’-বলাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ।

'না, সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেই আপনি ঠিক নন।'
'না, নির্বাচনে জিতেছেন বলেই রাষ্ট্র আপনার ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়।'
'না, দেশকে ভালোবাসি বলে সরকারের প্রতিটি সিদ্ধান্তকে ভালোবাসতে হবে না।'
'না, ধর্মীয় পরিচয় নাগরিকত্বের মাপকাঠি হতে পারে না।'
আর 'না, বিশ্ববিদ্যালয় কোনো রাজনৈতিক দলের জয় করার territory নয়।'


আর এখানেই বর্তমান বিপদটি আলাদা। যখন সংখ্যাগরিষ্ঠতার রাজনীতির সঙ্গে রাষ্ট্রক্ষমতা, ধর্মীয় পরিচয় এবং nationalism-এর পক্ষপাতদুষ্ট সংজ্ঞা জুড়ে যায়, তখন বিরোধিতা আর শুধু রাজনৈতিক বিরোধিতা থাকে না, তা খুব সহজেই ‘দেশের বিরুদ্ধে’ অপরাধে বদলে দেওয়া যায়। তখন বিশ্ববিদ্যালয়কে বলা হয় শোধরাতে হবে, শিল্পীকে বলা হয় সীমা জানতে হবে, ইতিহাসবিদকে বলা হয় কোন ইতিহাস মনে রাখতে (ও রাখাতে) হবে, আর ছাত্রকে বলা হয় কতটা প্রশ্ন করলে সে আর ‘ভালো নাগরিক’ থাকবে না।

সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে apolitical থাকা সত্যিকারের অপরাধ। কারণ apolitical হওয়াটাও শেষ পর্যন্ত একটা politics। আপনি যখন অন্যায়ের সামনে বলেন, “আমি politics-এর মধ্যে নেই”, তখন অন্যায়টা কিন্তু politics-এর বাইরে চলে যায় না। শুধু আপনার অবস্থানটা শূন্য হয়ে যায়। আর ক্ষমতা এই শূন্যস্থানগুলো খুব ভালোবাসে।
আর এই কারণেই আজ প্রতিরোধ এর বড্ড প্রয়োজন, কারণ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে বার বার কানমুলে মনে করিয়ে দেয়, তারও সীমা আছে... এই কারণেই প্রশ্ন করা আজ ভীষণ প্রয়োজন, কারণ প্রশ্ন ছাড়া শিক্ষা যে সমাজ গড়ে, সেখানে সবাই একই কথা বলতে শুরু করে, বা বলা ভালো অন্য কথা বলার স্পর্ধা হারিয়ে ফেলে। আর হারানো স্পর্ধাই ডেকে আনে কালেকটিভ অ্যাম্নেশিয়া...
কিন্তু যদ্দিন যাদবপুর আছে, যদ্দিন মুক্তমনা ছাত্ররা আছে, তদ্দিন স্পর্ধা আছে, থাকবে...

মনে রাখবেন যাদবপুরকে দখল করা যায় না, কারণ যাদবপুর কোনো জমি নয়, কোনো পতাকা নয়, কোনো দলের সম্পত্তিও নয়। যাদবপুর একটা অভ্যাস...প্রশ্ন করার, প্রতিবাদ করার, মাথা না নোয়ানোর।

Comments

Popular posts from this blog

আজি হসন্ত জাগ্রত দ্বারে

যাদবপুর সম্পর্কে দু চারটি কথা যা আমি জানি...

The dilemma of a teacher-practitioner.