সেলাম Gen Z, পারলে তোমরাই পারবে!


প্র
ত্যেক প্রজন্মই হয়তো একদিন সেই কাকুটা হয়ে যায়, যাঁকে ফ্যামিলি ফাংশনে দূর থেকে দেখলেই হালকা করে কেটে পড়তে হয়। 

কিন্তু কি জানি হয়তো আমরাও ধীরে ধীরে টার্মিনেটর এর T-800 সাইবর্গটার মতো সেই কাকুটায় মর্ফ হয়ে যাচ্ছি।

অথচ আমরা মিলেনিয়ালরা তো অন্য রকম হব ভেবেছিলাম। আমরা প্রশ্ন করতাম, বড়দের বিরক্ত করতাম, অভিযোগ করতাম যে আমাদের কেউ বোঝে না... তারপর চাকরিতে পসার  হলো, সস্তা হুইস্কি স্কচে বদলালো,  টেবিলের এপার থেকে ওপারে গেলাম, রিক্রুটমেন্ট এর দায়িত্ব নিয়ে, আর অবাক কাণ্ড একদিন শুনলাম নিজেই বলছি, “উফ এই জেনারেশনটা আসল পরিশ্রম কাকে বলে জানেই না, আমাদের সময়ে... ইত্যাদি ইত্যাদি।”

কম বেশি আমরা সবাই বলেছি এই কথা গুলো । ইন্টারভিউ নিতে গিয়ে, মিটিংয়ে, ক্লাসরুমে... একটু গা-ছাড়া ভাব, বা অধৈর্য, আধ খাপছাড়া উত্তর শুনে মনে হয়েছে... এদের কাছে সব কিছু যেন ঠাট্টার জিনিস...

ডব্লিউ. সি. ফিল্ডস এর একটা বিখ্যাত উক্তি আছে ‘comedy is a serious business’ আর এই সিরিয়াস ব্যাপারটা আমাদের সত্যিই শেখা দরকার জেন জি এর থেকে, কারণ চারপাশের সময়টাই এরকম যেখানে প্রকৃত অর্থেই একুশে আইন চলছে... রাস্তায় বই ফেলে পুড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে, প্রতিবাদ, প্রতিরোধের কণ্ঠকে দেশদ্রোহের তকমা দিয়ে আটক করা হচ্ছে... এমনকি চিরপ্রচলিত ব্যঙ্গ বিদ্রুপ বা কৌতুক কেও পড়তে হচ্ছে রাজরোষের মুখে... গুরুগম্ভীর রাজনেতারা নিজেদের ইমেজ নিয়ে এতটাই সিরিয়াস যে তাকে দেখে কোনও তরুণ হেসে ফেললে, বা স্যোশাল মিডিয়ায় একটা পোস্ট করলে সেটা রাজনৈতিক ঘটনা (অপরাধ) হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

আসলে এই দক্ষিণপন্থী ক্ষমতা চায় শর্তহীন শ্রদ্ধা,  কিন্তু ভাগ্যের ফেরে একটা গোটা প্রজন্ম সেটা জোগান দিতে নারাজ... সত্যি খেলা জমে গেছে... দেখতে হেব্বি আমোদ হচ্ছে যে... জনসভা তৈরি, ভারী ভারী বক্তৃতা তৈরি, ক্যামেরা তৈরি, টেলিপ্রম্পটার ও তেরো লাখি সুট বুট তৈরি... সবাই সাবধান, উলঙ্গ রাজা আসছে...সবার মুখে যেন থাকে যথাযথ মুগ্ধতা! কিন্তু একি? জেন জি এসে হাজির কতগুলো ‘অসভ্য’ মিম আর বেয়াড়া কিছু প্রশ্ন আয়না নিয়ে। যে প্রশ্ন গুলো বর্ষার পর নতুন রাস্তার পিচের নিচে চেপে দেওয়া হয়েছিল, ‘আমাদের চাকরি কোথায়?’  ‘আমাদের পরীক্ষার কী হল?’  ‘কুচু পুচু তুম রিসাইন কিউ নেহি করতে?’ ‘error 404 accountability not found’... এ কী অসভ্যতা! রমকম এর কিউ এর মতো বক্তৃতা শেষে এরা হাততালি দিচ্ছে না কেন মিত্রোওওও???? 

বছরের পর বছর এই ফ্যাসিস্ট সরকার আমাদের এক মিথ্যা শক্তির অভিনয় দেখিয়ে এসেছে। যেখানে সুপ্রিম নেতাকে শক্তিশালী দেখাতে হবে। তাঁর বক্তৃতায় দেড় মিলি কান্নার সাথে থাকতে হবে অখণ্ড ঘৃণামিশ্রিত শক্তির ঝনঝনানি । সাথে অন্ধসমর্থকদের সারাক্ষণ বুঝিয়ে যেতে হবে, সব কিছু কত বিকশিত, কত ঠিক চলছে...

কিন্তু এই চিরচেনা সমীকরণে অ্যানমালির মতো কিছু ছাত্রছাত্রী রাস্তায় জড়ো হল, যাদের মোটেও এই রাজনীতির সেট চিত্রনাট্য মেনে চলার ধৈর্য বিশেষ নেই। রাজনীতি মানেই যে গম্ভীর মুখে গম্ভীর ভাষায় কথা বলতে হবে, ওরা তাও মানে না। ওরা কাজে মজা করতে জানে, আর মজায় কাজ করতে পারে,  ওরা সম্ভ্রমের ধার না-ও ধারতে পারে,  ওরা অধৈর্যও হতে পারে। কিন্তু আবার ঠিক কোন কারণে ওরা রেগে আছে, সেটাও দিব্যি সহজে জানিয়ে দিতে পারে।

আর আমরা, এই সহজ ভঙ্গিটাকেই উদাসীনতার সাথে গুলিয়ে ফেলেছিলাম।

আর সেখানেই জাজ্বল্যমান নেহা বোরা।

ভেবে দেখুন একবার, মহিলা পুলিশকর্মীরা যখন হিংস্র ভাবে ওকে তুলে নিয়ে যাচ্ছে, তখনও মুখে সেই হাসি। ছবিটা ভোলার নয়, নেহার তখন কী মনে হচ্ছিল, তা আমি জানি না। আর জানার মিথ্যে ভানও করব না। কিন্তু আমার বার বারই মনে হয় ওই একটা ছবি রাষ্ট্রের ভয় দেখানোর গোটা আয়োজনটাকেই একটু বেকায়দায় ফেলে দেয়। যাকে ভয় দেখানো হচ্ছে, তার তো ভয় পাওয়ার কথা। তাহলে সে হাসছে কেন?  ক্ষমতা যে নিজেকে সর্বশক্তিমান ভেবে তৃপ্তি পাবে, এই দৃশ্যতো তাকে সেই সুযোগটুকুও দিচ্ছে না।

যেন রবি ঠাকুরের মতোই বলছে “আমাদের  শক্তি মেরে  তোরাও   বাঁচবি নে রে,  বোঝা তোর   ভারী হলেই ডুববে তরীখান”

সত্যিই তো ফ্যাসিবাদীর কল্পনায় নেহার মতো মানুষের জন্য বিশেষ জায়গা নেই। তাদের চাই বাধ্য নাগরিক, কৃতজ্ঞ দর্শক, আর এমন এক তরুণ প্রজন্ম, যাদের দেশপ্রেম মাপা যাবে রাষ্ট্রঅনুমোদিত স্লোগান কত উচ্চস্বরে গাইতে পারছে তা দিয়ে। দেশকে ভালোবাসে বলেই যে দেশের সরকারকে প্রশ্ন করছে বা করতে পারে, এমন একজন মানুষ সেখানে বেশ সমস্যার। আর প্রশ্ন করবি তো কর, তাও আবার হাসিমুখে? এ তো ভারী মুশকিল।

আজকাল কেন জানি না বার বার মনে হচ্ছে এই অচল সিস্টেমটার যে বদলটা দরকার, তার হাল একমাত্র জেন জ়ি-ই ধরতে পারে। আমরা তো বরাবর শুনে এসেছি,  প্রত্যাশা কমাতে হবে... একটু মানিয়ে নিতে হবে... এই দমবন্ধ করা চক্রটা ভাঙার জোর  যেন এই ছেলেমেয়েগুলোর মধ্যেই দেখছি। 

লাল সেলাম নেহা বোরা, সেলাম অভিজিৎ দীপকে, সেলাম সৌরভ দাস, আশুতোষ রাঙ্কা...এভাবেই  হাসিমুখে লড়াই চালিয়ে যাও তোমরা... এই ফ্যাসিস্ট সরকার যদি সর্বশক্তিমান সুপারম্যান হয়, তোমরাই তার সুযোগ্য ক্রিপ্টনাইট... 


Comments

Popular posts from this blog

আজি হসন্ত জাগ্রত দ্বারে

শিক্ষক নাকি প্র্যাকটিশনার… এ ভারী অদ্ভুত দোলাচল।

যাদবপুর সম্পর্কে দু চারটি কথা যা আমি জানি...