ফ্যাসিবাদকে রুখতে কমিউনিস্ট না হলেও চলবে!

 
সাল তারিখ ঠিক মনে নেই, তবে আগের জন্মের কথা, শীতকালের প্যারিস, ক্রিসমাসের কদিন আগেই হবে, তবে যুদ্ধের কারণে আলো টালো অন্যবারের থেকে একটু কম… আমরা আমাদের রোজকার রিচুয়াল অনুযায়ী বিস্ত্রোরএক কোণে বসে অ্যাবসিন্থ খাচ্ছিলাম।দালি ছিলো, বুনুয়েল ছিলো, বেলো আর লোরকা ছিলো, আরও দু একজন ছিলো এখন ঠিক মনে পড়ছে না... বুঝতেই পারছেন আগের জন্মের গল্প, জাতিস্মর হলেও মুকুল তো নই কাজেই... যাকগে মোদ্দা কথা হলো তখন ইউরোপে বেশ ভালোই যুদ্ধ ঘনিয়ে আসছে, কাজেই দ্বিতীয় অ্যাবসিন্থটার পর, আমরা পণ নিয়েছি, রাতের মধ্যেই যুদ্ধ, কমিউনিজম এবং মানবসভ্যতার ভবিষ্যৎ নিয়ে একটা চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছতে হবে(থার্ড গ্লাসের পর এ ধরনের আত্মবিশ্বাস অস্বাভাবিক কিছুনা)। বেলো বলছিল কমিউনিজমই ফ্যাসিবাদকে রুখবে। ওদিকে বুনুয়েল কমিউনিস্টদের নিজেদের মধ্যে ঝগড়ার ইতিহাস তুলে ধরছিল। এসবে একটা কান দিয়েও দালি ন্যাপকিনে একটা কিম্ভুত মার্কা ঘড়ি আঁকছিল। আমাদের তর্কে তার খুব একটা বিশেষ আগ্রহ ছিল না। বরং ঘড়িটা কেউ লক্ষ করছে না, সেটাই তাকে বেশি বিরক্ত করছিল।

বারের আরেক কোণে হেমিংওয়ে একা একা বসে ডাইকিরি খাচ্ছিল। মুখে সেই পরিচিত বিরক্তি, আমাদের টেবিলের তর্ক তাঁর কানে পৌঁছেছে কি না জানি না। তবে মুখ দেখে মনে হচ্ছিল, পৌঁছেছে।

নেশার ঘোরে আমি উঠে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, “আপনি কি কমিউনিস্ট?”
গ্লাস থেকে চোখ না তুলেই বললেন, “না। আমি অ্যান্টি-ফ্যাসিস্ট।”
আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম “কত দিন ধরে?”
একটু হেসে(এবার তাকিয়ে) বললেন, “যেদিন থেকে ফ্যাসিবাদ বুঝেছি।”



কাল প্রদীপ্ত দার পোস্ট করা ছবিটা দেখে বহুদিন পর সেই স্মৃতি ফিরে এলো। এসআরএফটিআইয়ের ছাত্রের রক্তে লেখা RSS। সামান্য এই তিনটি ইংরেজি অক্ষর লিখতে ছাত্রদের শরীর চুঁয়ে রক্তে ঝরেছে, অথচ তারপরেও নিশ্চয়ই কেউ জানতে চাইবে, ছেলেগুলোর চুল এত বড় কেন, বা মেয়েটার চুল নীল কেন? নিজেদের প্রতিষ্ঠানের প্রেক্ষাগৃহে একটি রাজনৈতিক কর্মসূচি হচ্ছে কেন, শুধু সেই প্রশ্ন তুলেছিল ওরা। জবাব এসেছে ছুরি আর লোহার রডে। বাহ দুর্দান্ত। আসলে প্রশ্ন করলে উত্তর দিতে যুক্তি লাগে। আর নির্দয় আক্রমণ করলে শুধু লোক লাগে। তাই অবশ্যই সেটাই বেটার চয়েস!

যে সত্যজিৎ রায় গণশত্রু  বানিয়েছিলেন, তাঁর নামের সঙ্গে যুক্ত একটি প্রতিষ্ঠানে ছাত্ররা প্রশ্ন করবে, এতে আশ্চর্য হওয়ার কথা নয়। বরং আশ্চর্য লাগে এটা ভেবে যে আক্রমণকারীরা ভেবেছিল সিনেমা পড়তে আসা ছেলেমেয়েরা চুপচাপ বসে সব মেনে নেবে।

অবশ্য ছাত্রদের নিয়ে আমাদের সমাজের উদ্বেগের শেষ নেই। কানে দুল কেন? নীল চুল কেন? মেয়েবন্ধু কেন? সিনেমা পড়ে চাকরি হবে? এতগুলো জরুরি প্রশ্নের ভিড়ে ছাত্রদের মাথায় আঘাত করা হয়েছে কি না, সেটা চাপা পড়ে যায়। কারণ যে ছাত্র সিনেমা পড়ে, বই পড়ে, ইতিহাস পড়ে, সে একটা ভয়ানক কাজ আজও করতে পারে… পাল্টা প্রশ্ন।
আমাদের যাদবপুরেও এই প্রশ্ন করার অভ্যাসটা অনেকের অসহ্য লাগে। বিশ্ববিদ্যালয় থাকবে, কিন্তু ছাত্ররা অধ্যাপককে ‘আপনি ভুল’ বলবে না। উপাচার্যকে জবাবদিহি করতে বলবে না। প্রধানমন্ত্রী বা মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে দ্বিমত করবে না। আনন্দ পটবর্ধনের রাম কে নাম দেখবে, কিন্তু রামকে ভালোবাসা আর রামের নামে রাজনীতি করার ফারাক বুঝবে না। কিয়ারোস্তামির ছবি দেখবে, কিন্তু কে কথা বলার অধিকার পাবে, কার গল্প চাপা দেওয়া হবে, এসব ভাববে না। এমন একটা বিশ্ববিদ্যালয় থাকলে শাসকদের বড্ড অসুবিধা হয়। কারণ চলতি বায়নারিতে আজ প্রশ্নকারী ছাত্রকে ‘অ্যান্টি-ন্যাশনাল’ বলা হবে, কাল শিল্পীকে ‘দিমাগি নকশাল’, পরশু অধ্যাপককে অন্য কিছু। নাম গুলো বদলাবে। প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে প্রশ্নকর্তাকে সন্দেহের মুখে ফেলার কৌশলী অ্যাজেন্ডাটা বদলাবে না।

আর যাঁরা পাশে দাঁড়ান, তাঁদের জন্য রয়েছে আরো উন্নততর অনলাইন হাতিয়ার। বক্তব্যের উত্তর দিতে হবে না,  পুরোনো ছবি খুঁজে , ব্যক্তিগত জীবন ঘেঁটে , পরিবারকে টেনে, সারারাত ইনবক্সে থ্রেট পাঠান। মানুষটার ঘুম নষ্ট হোক, মাথা খারাপ হোক, আর পরের বার কিছু লেখার আগে ভয়ে হাত পা কাঁপুক। তারপর সেই নীরবতা দেখিয়ে বলুন,  “দেখলে তো, কেউ প্রতিবাদ করছে না।” বাহ অসাধারণ আর্ট অফ ওয়ার। ওদিকে ভোটার তালিকা থেকে মানুষ বাদ পড়ছেন, নাম ফেরাতে আবেদন করছে। আর আমরা ভাবছি, “আমার নাম তো আছে।” চমৎকার। যত দিন আছে, তত দিন সমস্যাটা সত্যিই অন্যের। আর এতকিছুতে অসহ্য হয়ে ভুলেও আপনি আপত্তি জানাতে গেলে, বা বিক্ষোভ প্রকাশ করলে আপনার দিকে প্রথম প্রশ্নটাই উড়ে আসবে, “আপনি কি কমিউনিস্ট?”

সেদিন রাতে হেমিংওয়ের কথাটা বুঝিনি। ভেবেছিলাম, ফ্যাসিবাদের বিরোধিতা করতে হলে আগে কোনও একটা রাজনৈতিক শিবির বেছে নিতে হয়। এখন বুঝি, নিজের রাজনৈতিক মত থাকতেই পারে, কমিউনিজম নিয়েও আপত্তি থাকতে পারে। কিন্তু কারও উপর হামলা হলে, ভয় দেখিয়ে মুখ বন্ধ করানো হলে, মানুষের ভোটাধিকার নিয়ে প্রশ্ন উঠলে ‘না’ বলতে কোনও দলের সদস্যপদ লাগে না। আর যারা আনুগত্যকেই দেশপ্রেম বলে চালাতে চায়, তাদের সঙ্গে এই তর্কটাও বোধহয় করা যায় না। কারণ তর্কের প্রথম শর্ত হল অন্য মানুষটিকে প্রশ্ন করতে দেওয়া… 

সে রাতে দালির আঁকা ঘড়িটা শেষ পর্যন্ত ন্যাপকিন থেকে টেবিলে গলে পড়েছিল কি না, মনে নেই। তবে সময়টা যে পচে গলে  ফুরিয়ে আসছে, সে ব্যাপারটা দালি বোধহয় আমাদের আগেই বুঝেছিল।

Comments

Popular posts from this blog

আজি হসন্ত জাগ্রত দ্বারে

যাদবপুর সম্পর্কে দু চারটি কথা যা আমি জানি...

The dilemma of a teacher-practitioner.